তাঁর স্ত্রী
অনুবাদ: ঊষাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়
নিকোলাস রাগে ফেটে পড়েন—কতবার তোমাকে বারণ করেছি আমার টেবিল গোছাবে না। তুমি গোছগাছ করলেই জিনিসপত্তর আমি আর খুঁজে পাইনে। কাজান থেকে কাল যে আমাব টেলিগ্রাম এসেছিলো, সেটা কোথায় গেলো?
পরিচারিকা মেয়েটি বেশ রোগা। বিষন্নমুখ। নিরীহ নিরীহ ভাব। দেখলে মনে হবে ভিজে বেড়ালটি। কিছুই যেন জানে না। মুখে কথ্য নেই। টেবিলের নীচে বাজে কাগজের বুড়িটা হাতড়ে কয়েকটা টেলিগ্রাম ডাক্তারের দিকে বাড়িয়ে দেয় শুধু। কিন্তু আসল টেলিগ্রামটা ওর মধ্যে নেই।
সবই স্থানীয় রোগীদের।
তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো পড়ার ঘরে, বসার ঘরে। কোথাও হদিস মিললো না। তখন ডাক্তার গেলেন তাঁর স্ত্রীর ঘরে।
সময়টা ছিল গভীর রাতের। ডাক্তার জানেন ওলগার ফিরতে এখনও বেশ কিছুটা দেরী। ভোর পাঁচটার আগে ফিরবে না। ডাক্তারের খুব অস্বস্তি। স্ত্রীকে তিনি আদৌ বিশ্বাস করেন না। রাতে যতক্ষণ ওলগা বাইরে থাকে তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না। স্ত্রীকে তিনি শ্রদ্ধার চোখে দেখেন না। ঘৃণা করেন তাঁকে। তাঁর বিছানাকে, তার ব্যবহৃত প্রতিটি জিনিস—আয়না, চকলেটের বাক্স পর্যন্ত। কে যেন রোজ ভালোবেসে ওলগাকে পাঠায় স্থলপদ্ম, রক্তাভ নীল হায়াসিন্থ। ঐ ফুলগুলো তার দুচক্ষের বিষ। ক্রমশঃই ডাক্তার রেগে যান, বিরক্ত বোধ করেন। তবুও তাঁর মনে হয় ভাইয়ের টেলিগ্রামটা খুঁজে পেলে তিনি যেন স্বস্তি পান, খুশী হন।
একটা টেলিগ্রাম অবশ্য পাওয়া গেলো ওলগার সাজসজ্জার টেবিলের প্যাডের তলায়। হাতে নিয়ে দেখলেন মন্টিকার্লো থেকে এসেছে শাশুড়ীর ঠিকানায় ওলগার নামে। মিচেলের পাঠানো এই টেলিগ্রামটা ইংরেজী ভাষায় লেখা। তাই কিছুই তাঁর বোধগম্য হলো না।
মিচেলই বা কে? মন্টি কার্লো থেকে শাশুড়ীর ঠিকানাতেই বা এলো কেন?
ডাক্তারী পেশা ছেড়ে দিয়ে বিবাহিত এই সাত বছর যদি তিনি স্ত্রীর পেছনে লেগে থাকতেন তাহলে অবশ্যই তিনি একজন উঁচুদরের সত্যান্বেষী হতে পারতেন।
ডাক্তার নানা সন্দেহের দোলায় দুলতে থাকেন, আর ভাবতে থাকে—ঠিক তো, বছর দেড়েক আগে তিনি একবার তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে গিয়েছিলেন। কিউবান রেস্তোরাঁয় তাঁর এক সহপাঠী বন্ধুর সঙ্গে যখন তিনি খাচ্ছিলেন তখনই তো মিচেল রিস নামে বাইশ-তেইশ বছরের এক তরুন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছিলো। মাস দুয়েক পরেই কিন্তু ঐ মিচেল নামের ছেলেটির ছবি দেখেছিলো ওলগার অ্যালবামে। ফরাসী ভাষায় ছবির নীচের লেখা ছিল—"স্মৃতিতে এখন এবং ভবিষ্যতের আশায়”। এর পরেও কিন্তু ছেলেটিকে শাশুড়ির বাড়ীতে ডাক্তার কয়েকবার দেখেছিলেন।
ঐ সময় থেকেই স্ত্রী বাহিরমুখী হয়ে পড়ে এবং অনেক রাত করে বাড়ী ফেরা যেন তার অভ্যেসে দাঁড়ায়। মাঝে মাঝে একটা ছাড়পত্রের জন্যে বায়নাও করতো ডাক্তারের কাছে। কিন্তু তিনি কান দিতেন না ঘর-সংসার দেখাশুনোর অসুবিধে হবে বলে।
ছ'মাস আগে ডাক্তারের বন্ধুরা সিদ্ধান্তে এলেন যে ডাক্তার নিকোলাস যক্ষা রোগাক্রান্ত হয়েছেন। বন্ধুদের এই সিন্ধান্তে শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো ক্রিমিয়ায় গিয়ে তাঁকে বিশ্রাম নিতে হবে। স্ত্রী ওলগাও বায়না ধরলো স্বামীর সঙ্গে যাবে বলে, অসুস্থ স্বামীর সেবা যত্নের জন্যে তাঁর যাওয়া একান্ত প্রয়োজন। তবে ক্রিমিয়ায় বড় ঠান্ডা। জায়গাটাও সাদামাঠা। তার চাইতে নিস জায়গাটা অনেক ভালো।
ডাক্তার বেশ বুঝতে পারলেন সেদিন কেন তার স্ত্রী তার সঙ্গে যেতে চেয়েছিলো। যেহেতু মিচেল সেখানে থাকে।
ইংরেজি রুশ অভিধান খুঁটিয়ে দেখে তর্জমা করে-না বোঝা গেলো—
আমার আদরের প্রিয়তমার ছোট্ট পায়ের পাতায় চুম্বন। বারবার পৌঁছনোর আশায় উন্মুখ।
ভাবতে লাগলেন নিসে ওলগাকে নিয়ে গেলে বিশ্রীভাবে নিজে ছোট হয়ে যেতেন। হতাশায় চোখে জল এসে যায় তার। এঘর-ওঘর শুধু পায়চারি করতে থাকেন। বনেদী বংশের ছেলে তিনি। তাঁর আত্মমর্যাদায় ঘা লাগা খুবই স্বাভাবিক। পড়াশুনো গির্জার স্কুলে। সাধারণভাবে মানুষ হয়েছেন তিনি। গ্রাম্য যাজকের ছেলে হয়ে একজন নীচ, অসৎ লালসা-কাতর মেয়ের কাছে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments